রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ০৩:৫৬ পূর্বাহ্ন
ওয়াজ মাহফিলের নামে সড়কে চাঁদা আদায়, শিশু মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনা—এবার থামবে কি এই অনিয়ম?
মাসুম হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি, বগুড়া
তাফসীরুল কুরআন মাহফিল (ওয়াজ মাহফিল) নামে টাকা তুলতে গিয়ে বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। এমনকি সড়ক দুর্ঘটনায় এক শিশুর মৃত্যুও হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, চাঁদা না দেওয়ায় মারধরের ঘটনাও ঘটছে। এছাড়াও সড়কে দুর্ভোগ সৃষ্টির অভিযোগও নতুন নয়।
গাজীপুর কালিয়াকৈর উপজেলার বাসিন্দা জাফর সর্দার। তিনি বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানের পণ্যবাহী ট্রাকের চালক।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি দুপুরে বগুড়া শহরের গোহাইল সড়কের কৈগাড়ী এলাকায় মারধরের শিকার হন জাফর। সেখানে ওয়াজ মাহফিলের জন্য গাড়ি থামিয়ে টাকা তোলা হচ্ছিল। ওই সময় ট্রাকে পণ্য নিয়ে সেই সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলেন জাফর। হঠাৎ তার ট্রাকের সামনে ওয়াজ মাহফিলের প্রতিনিধিরা দাঁড়িয়ে পড়েন। এসময় কোনোভাবে ট্রাক নিয়ন্ত্রণ করেন জাফর। তখন কিছুটা বিরক্ত হয়ে তিনি চাঁদা আদায়কারীদের জানান যে তিনি ওয়াজ মাহফিলের জন্য টাকা দেবেন না। এতে চাঁদা আদায়কারীরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে ট্রাক থেকে নামিয়ে নিয়ে বেঁধড়ক মারধর করেন। পরবর্তীতে সেখানে কৈগাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই মানিক মিয়া উপস্থিত হয়ে বিষয়টি মীমাংসা করে দেন। তবে এরমধ্যে মারধরের শিকার হয়ে জাফর আহত হয়ে পড়েন। সেইসাথে তার পরনে থাকা টি-শার্টও ছিঁড়ে যায়।
জাফর জানান, ওয়াজ মাহফিলের জন্য টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মারধর করা হয়। এসময় জাফর প্রশ্ন রাখেন কত জায়গায় টাকা দেব? সারা সড়ক জুড়ে ওয়াজ মাহফিলের নামে টাকা তোলা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২২ ফেব্রুয়ারি কৈগাড়ী পূর্বপাড়ায় একটি ইসলামীর ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় বায়তুল জামে মসজিদের উন্নয়নের জন্য এ মাহফিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জাফরকে মারধর করেন সেই ওয়াজ মাহফিলের আয়োজক কৈগাড়ী পূর্বপাড়া যুব উন্নয়ন সংঘের সদস্যরা।
এর আগে, গত ২৩ জানুয়ারি বিকেলে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলায় ওয়াজ মাহফিলের চাঁদা আদায় করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়। উপজেলার বৃ-কুষ্টিয়া এলাকায় কামারপাড়া সড়কের দারুল হাদীস সালাফিয়া ও তাহফিজুল কুরআন মাদ্ররাসা সংলগ্ন এলাকায় ওই দুর্ঘটনা ঘটে। মৃতের নাম মুসাব্বির। ১০ বছর বয়সী মুসাব্বির একই উপজেলার আমরুল ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামের আমিনুল ইসলামের ছেলে। সে ওই উপজেলার ক্ষুদ্র ফুলকোটের ইসলামিয়া হাফেজিয়া মাদ্ররাসা ও ইয়াতীমখানার হিফজ বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল।
মুসাব্বির ওয়াজ মাহফিলের জন্য অন্যদের সঙ্গে সড়কে দাঁড়িয়ে চাঁদা তুলছিল। ওই সময় মালবাহী এক ভ্যানের সামনে তারা দাঁড়ায়। চালক তৎক্ষণাৎ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ভ্যান থেকে একটি বস্তা মুসাব্বিরের শরীরের ওপর পড়ে। এতে তার মৃত্যু হয়।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি একই উপজেলার মাদলা-মালিপাড়া সড়কের কাজীপাড়া এলাকায় মাটি দিয়ে গতিরোধক তৈরী করা হয়েছিল ওয়াজ মাহফিলের টাকা আদায়ের জন্য। টাকা তোলা শেষে সড়কে মাটি রেখেই চলে যান আদায়কারীরা। এতে ওই স্থান যানবাহন চলাচলের জন্য ঝুকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
জানতে চাইলে বগুড়া ইসলামি ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক
শাফিউজ্জামান বলেন, বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে স্থানীয় মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে জনগণকে আমরা সচেতন করি। এছাড়াও ওয়াজ মাহফিলের আয়োজনের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতিও নিতে বলা হয়। তবে ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে পয়সা আদায়কারীদের বিষয়ে আমাদের কোনো বার্তা নেই। ওই বিষয়টা আমরা দেখি না। এটা প্রশাসনের বিষয়।
এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার বিভাগের বগুড়ার উপপরিচালক মাসুম আলী বেগ জানান, ওয়াজ মাহফিলের টাকা আদায়ের বিষয়ে তাদেরকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন থেকেও সতর্ক বার্তা দেওয়া হবে।